বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ১২:১৫ অপরাহ্ন
১৯ জুলাই ঢাকার রাস্তায় রক্ত, বারুদ আর বিদ্রোহ!
অনলাইন ডেস্ক
চব্বিশের ১৯ জুলাই। ঢাকার রাজপথে যেন আগুনের নাচ। ছাত্র-জনতার তীব্র বিক্ষোভে গোটা দেশ রূপ নেয় রণক্ষেত্রে। সেদিনের ভয়াল সংঘর্ষে প্রাণ হারান অন্তত ৩০ জন। ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ পালনে ছাত্র-জনতা হয়ে ওঠে একেকজন অগ্নিমন্ত্র। সড়ক দখলে নেয়া ক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীদের দমাতে মরিয়া হয়ে ওঠে সরকার। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও দলীয় ক্যাডারদের দিয়ে গুলি চালানো হয় এমনকি হেলিকপ্টার থেকেও। রাজধানী ঢাকা মুহূর্তেই পরিণত হয় মৃত্যুপুরীতে। রাত ১২টা থেকে শুরু হয় অনির্দিষ্টকালের কারফিউ।
বারুদের ঝাঁঝ আর টিয়ার শেলের ধোঁয়ায় ঢাকার বাতাস হয়ে ওঠে বিষাক্ত। রামপুরা, যাত্রাবাড়ী, নিউমার্কেট, কুড়িল, মহাখালী, উত্তরা—যেখানেই চোখ যায়, সেখানেই সহিংসতার আঁচ। পথ যেন শ্মশান।
আন্দোলনকারীদের ঠেকাতে বেপরোয়া হয়ে ওঠে পুলিশ। গুলির শব্দে কেঁপে ওঠে নগরী। চালানো হয় টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড। শহরটা যেন একটাই বার্তা দেয়—ভয়ের নগরীতে স্বৈরতন্ত্রের ছায়া।
গুলশান-১-এ ইটপাটকেলের পর ভাঙচুর হয় দুটি বেসরকারি ভবনে। মহাখালীতে আগুন জ্বলে দুটি গাড়িতে, রেল ও সড়ক অবরোধ করা হয়। নিউমার্কেটে আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুলিশ ফাঁড়িতেও।
যাত্রাবাড়ীতে দেখা যায় দিনের সবচেয়ে ভয়ংকর সংঘর্ষ। সকাল থেকে রাত—টানা ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা। পুলিশের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়ে মহাসড়ক। সন্ধ্যার পর সংঘর্ষ আরও রক্তাক্ত হয়ে ওঠে। এ সময় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে থেমে যায় যান চলাচল। সন্ধ্যায় হামলা হয় বিটিভিতে—স্বৈরাচারের মুখপাত্র হিসেবে চিহ্নিত প্রতিষ্ঠানটি রেহাই পায়নি।
মালিবাগ রেলগেট থেকে রামপুরা বিটিভি ভবন পর্যন্ত কয়েক কিলোমিটার সড়ক বিক্ষোভে উত্তাল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে প্রাণহানিতে ক্ষোভে ফেটে পড়ে জনতা।
এখন শুধু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও যোগ দেন রাজপথে। কুড়িলে র্যাব হেলিকপ্টার থেকে ছোড়ে টিয়ারশেল। ছত্রভঙ্গ করতে চলে সাউন্ড গ্রেনেড, গুলি।
উত্তরাতেও সহিংসতা ছড়ায়—গাড়ি পোড়ে, মানুষ আহত হয়। মোহাম্মদপুরে পুলিশের সঙ্গে একদল মানুষের সংঘর্ষ চলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
ঢাকা মেডিকেলের মর্গে পৌঁছাতে থাকে একের পর এক মরদেহ। যাত্রাবাড়ী এলাকায় নিহত হন সর্বোচ্চ ৫ জন। আহত শতাধিক, কেউ ঢামেকে, কেউ শহরের ক্লিনিকে চিকিৎসা নিচ্ছেন গোপনে।
এই অবস্থায় পুলিশের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা হারুন অর রশিদ ঘোষণা দেন—সব বিশৃঙ্খলাকারী ও তাদের সহযোগীদের আইনের আওতায় আনা হবে।
আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সরাসরি অভিযোগ করেন—বিএনপি-জামায়াত এই আন্দোলনে হস্তক্ষেপ করছে। শেখ হাসিনা বাধ্য হয়ে গুলি ও কারফিউর অনুমতি দেন। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় বিএনপি মহাসচিব ফখরুল ইসলাম বলেন—সরকারই সবকিছুর দায় এড়াতে চায়, কিন্তু আন্দোলন এখন রাষ্ট্রপুনর্গঠনের দাবি।
সকালে জাদুঘরের সামনে ব্যানার নিয়ে অভিভাবকরা অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। শেখ হাসিনার পদত্যাগ দাবি করেন অনেকে। ঢাকাজুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ, সড়কে নীরবতা। মোটরসাইকেল চলাচলেও জারি হয় নিষেধাজ্ঞা।
রাত ১২টা থেকে সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা আসে—অনির্দিষ্টকালের জন্য দেশজুড়ে কারফিউ। গণভবনে ১৪ দলের সঙ্গে বৈঠকের পর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক জানান—প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হবে। এরই মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রস্তুতি নিতে শুরু করে কারফিউ বাস্তবায়ন ও সেনা মোতায়েনের।